• সাক্ষীর অভাবে আটকে থাকে শুনানি
  • তদন্ত, চার্জশিট প্রতিটি ধাপেই অস্বাভাবিক সময় ব্যয়
  • বিচারিক আদালতের রায়ের পরও হাইকোর্টে এসেই স্থবির
  • বিচার শেষের আগেই সংশ্লিষ্ট কোর্টের বিচারক বদলি
  • সাক্ষী আনার দায়িত্বে অবহেলা তদন্ত কর্মকর্তার
  • হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে মনিটরিং জরুরি:

মত বিশেষজ্ঞদের
তদন্তে সময়ক্ষেপণ। চার্জশিট দাখিলে গাফিলতি। সাক্ষী হাজিরে অপারগতা ও রাষ্ট্রপক্ষের অদক্ষতায় হত্যা মামলা নিষ্পত্তিতে কেটে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। কোনো কোনো মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে লেগে যাচ্ছে ২০ থেকে ২৫ বছরও। এতে যেমন বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতি দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে ন্যায়বিচার। আর এতে ভুগছেন বিচারপ্রার্থীরা। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে অস্বাভাবিক সময় লাগছে। শুধু তদন্তকাজ শেষ করতেই যাচ্ছে মাসের পর মাস। আদালতে পুলিশি প্রতিবেদন দাখিলেও বছর পার হচ্ছে।

২০২১ সালে আপিল নিষ্পত্তি হওয়া বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মামলা দায়ের থেকে শুরু করে প্রতিটি মামলার চূড়ান্ত বিচারকাজ শেষ করতে গড়ে সময় লেগেছে ২০ বছরেরও অধিক। কোনোটিতে পার হয়েছে দুই যুগও। এসব গুরুত্বপূর্ণ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়েও ধাপে ধাপে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা বিচারিক আদালতের রায়ের পরও হাইকোর্টে এসে আটকে আছে। তবে উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো সচলের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মামলার আইনজীবীরা। অবশ্য আইনজীবীরা মনে করেন, সাক্ষী হাজির না হওয়া ও জটের কারণে মনোযোগ হারায় হত্যা মামলার শুনানি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন কোনো আসামির ফাঁসি বহাল রাখেন, তখন ওই রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণত তিনি রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন। সেই রিভিউর শুনানি ও নিষ্পত্তি হতে ছয় মাস থেকে অনেক সময় দেড়-দুই বছরও লেগে যায়। বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতায় অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হলেও তা সমাজে অপরাধ দমনে কেমন প্রভাব ফেলে— এ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন; প্রয়োজন মনিটরিংয়েরও।

রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, হত্যা মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতে মনিটরিং করা জরুরি। যাতে নিম্ন আদালতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব মামলা স্বল্পসময়ের মধ্যে শেষ করা যায়। উচ্চ আদালতে দ্রুতহারে মামলা নিষ্পত্তি হলেও জট কমছে না। এর অন্যতম কারণ পুরোনো ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীরাও বিচারপ্রাপ্তির আশায় দিন গুনছেন।

সার্বিক পরিস্থিতিতে মামলাজট কমানো ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে এসব মামলার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে মনে করেন তারা। পর্যালোচনা করে এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, কোনো কোনো খুনের মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে ২৫ বছর। আবার কোনোটি ২০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলাগুলো নিম্নরূপ –

টগর হত্যা : ১৯৯৪ সালের ৩ জুলাই নওগাঁর কেশাই গ্রামের পুকুরে মাছের পোনা ছাড়া নিয়ে ঝগড়ার জেরে চিকিৎসক নুরুল ইসলাম তার লাইসেন্স করা পিস্তল থেকে গুলি ছোড়েন। তাতে টগর নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। নওগাঁর জজ আদালত ২০০৫ সালের ১০ জুলাই এ মামলার রায়ে নুরুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৮ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি করে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর নুরুল ইসলামের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১৮ জনেরও যাবজ্জীবন সাজা বহাল থাকে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল শুনানি শেষে ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাদের সবাইকে খালাস দেন।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ হত্যা : ১৯৯৬ সালের ৭ মে মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন তার স্ত্রী রাশিদা
পারভীন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ২০০৪ সালের নিম্ন আদালত আসামি জোসেফ ও মাসুদ রহমানকে ফাঁসির আদেশ দেন। এছাড়া বাকি তিন আসামি কাবিল সরকার, আনিস আহমেদ ও হাবিল আহমেদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। হাইকোর্টে আপিল করা হলে জোসেফের মৃত্যুদণ্ড বহাল ও মাসুদকে খালাস দেয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন জোসেফ। আপিলের শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর জোসেফের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন আপিল বিভাগ।

বাহারুল ইসলাম হত্যা : ২০০০ সালের ৬ আগস্ট দিবাগত রাত ২টায় ঝিনাইদহের শৈলকুপার শেখড়া গ্রামের মো. বাহারুল ইসলাম ওরফে বাকা চুন্নুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ৭ আগস্ট সকালে নিহতের ভাই ছিদ্দিক হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলায় ২০০৩ সালের ৮ জানুয়ারি এমদাদুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ৮ মে জামিন নিয়ে পালিয়ে যান এমদাদুল। মামলার বিচার শেষে ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর এমদাদুলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় দেন ঝিনাইদহের আদালত। মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। এ অবস্থায় ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি এমদাদুলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর আপিল করেন এমদাদুল। শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিল হাইকোর্ট এমদাদুলের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন এমদাদুল। পরে ২০২১ সালের ১২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. এমদাদুল মোল্লার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন।

কাশেম হত্যা : কোম্পানির কাজ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জেরে ২০০৪ সালের ২৮ মার্চ কাশেম চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় করা মামলায় ২০০৬ সালের ২১ মে হুমায়ুন ও জসিমকে মৃত্যুদণ্ড দেন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ মো. আব্দুল মান্নান। পরে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ওই মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে আপিল করেন হুমায়ুন। শুনানি নিয়ে ২০২০ সালে আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মো. হুমায়ুনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন।

রুপা বানু হত্যা : ২০০৫ সালের ৮ আগস্ট রাতে দুই সন্তানের জননী রুপা বানুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আবদুল মান্নান পরদিন নড়াইলের লোহাগড়া থানায় মামলা করেন। এ মামলায় নিম্ন আদালত ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড ও দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন কারাবন্দি আসামিরা। আর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে ২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিরা। পরে আপিলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। এছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির সাজা বহাল রাখা হয়।

বাশার হত্যা : চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের চারিয়া এলাকায় ২০০৩ সালে প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীরা আবুল কাশেম, আবুল বশর ও বাদশা আলম নামে তিন সহোদরকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। ওই মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেয়া আদেশ বহাল রাখেন।

অধ্যক্ষ গোপাল মুহুরি হত্যা : ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান এলাকায় বাসায় ঢুকে নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল মুহুরিকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে মামলাটি মহানগর হাকিম আদালত থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ওই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল হত্যাকাণ্ডে জড়িত চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানির ওপর রায় দেয়া হয় । এতে আজম, আলমগীর কবির ও তছলিম উদ্দিন মন্টুর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। পরে ২০০৮ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আলমগীর কবির রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। ২০২০ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।

আকলিমা হত্যা : ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ২০০৫ সালের ১৮ আগস্ট রাতে স্ত্রী আকলিমাকে হত্যা করেন তার স্বামী মোহসীন মোল্লা। পরে এ ঘটনায় আকলিমার পরিবার মোহসীনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০০৬ সালে আসামি মোহসীন মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেন ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এরপর মামলাটি হাইকোর্টে এলে ২০১২ সালে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামি। শুনানি শেষে দণ্ড সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

১৩ বছরের শিশু হত্যা : ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ রাতে দৌলতপুর উপজেলার লালনগর গ্রামের ১৩ বছর বয়সি এক শিশুকে তামাক খেতে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। পরদিন ভিকটিমের বাবা পাঁচজনকে আসামি করে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। ওই মামলার বিচার শেষে ২০০৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় দেন কুষ্টিয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আকবর হোসেন। পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে এবং আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট চারজনেরই মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ শুকুর আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। বাকিদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়।

গণি হত্যা : জেএমবির জঙ্গিরা ২০০৪ সালে জামালপুরে গণি গোমেজকে হত্যা করে। এ মামলায় ২০০৬ সালে সালেহীন ও রাকিবুল হাসান রাকিব গ্রেপ্তার হন। শুনানি নিয়ে ওই বছর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ গণি গোমেজ হত্যা মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও দুজনের আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্টেও তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন দুই আসামি। ১৭ বছর আগের এ হত্যা মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির শীর্ষ জঙ্গি সালাউদ্দিন সালেহীনের ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

তানিয়া হত্যা : ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকালে তানিয়া প্রাইভেট পড়ার জন্য নানাবাড়ি থেকে কলেজের উদ্দেশে গেলে পথে আসামিরা তানিয়াকে অপহরণ করে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে। এ ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০০৬ সালে বরিশালের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট ওই রায় বহাল রাখেন। পরে আপিল করেন আসামিরা। দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৬ বছর আগে দুই আসামির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যা : ২০০০ সালে সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে টিপু তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে যান। সঙ্গে ছিলেন তার দুই বন্ধু। পরে তার স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাসানী হলের পেছনে। সেখানে নিয়ে পেটে ছুরিকাঘাত করে স্ত্রীকে হত্যা করেন মাসুদ। এতে অংশ নেন তার দুই বন্ধুও। হত্যার পর ওই নারীর গলা কেটে পানিতে ফেলে দেয়া হয়। বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষে নিম্ন আদালত ওই তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে যা বহাল রাখেন হাইকোর্ট।হাইকোর্টের রায় বাতিল চেয়ে আসামিদের করা আপিল খারিজ করে দিয়ে মৃত্যুদণ্ড আপিল বিভাগেও বহাল রাখা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল বলেন, মামলার বিচার করবেন বিচারক। কিন্তু সেই বিচারকের যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে যথাসময়ে বিচার পাওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আগে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর একজন আসামিকে চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। এছাড়া হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সালের ক্রমঅনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত রিভিউর শুনানির উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই হত্যা মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে সময় কমে আসবে।

ফরিদপুর জজকোর্টের আইনজীবী মোসাদ্দেক আহম্মেদ বশির বলেন, বিচারের সাথে দীর্ঘসূত্রতা বেমানান। একজন আসামিকে কেন ১০-১২ বছর কনডেম সেলে থাকতে হবে। আসলে আমাদের দেশে সিস্টেমেই গলদ আছে। এই দীর্ঘসূত্রতায় আসামি ও ভিকটিম দুজনই হয়রানির শিকার হতে পারেন। নিম্ন আদালতে কোনো আসামির ফাঁসি হলে ভিকটিমের স্বজনরা চান দ্রুত ফাঁসি কার্যকর হোক। কিন্তু সব বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেই দণ্ড কার্যকরে যদি ১৫-২০ বছর চলে যায়, তাহলে বিচারের প্রতি বিচারপ্রার্থীর এক ধরনের আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়।

জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, মামলা নিষ্পত্তির প্রধান বাধা সঠিক সময়ে সাক্ষী হাজির করতে না পারা। সাক্ষী না এলে বিচারক বিচার করবেন কীভাবে। খুনের মামলার সাক্ষী আনার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। সেই সাক্ষীকে তাগাদা দিয়ে আদালতে দাঁড় করানোর দায়িত্ব পিপির। এই দায়িত্ব কী সব মামলায় সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে? তাই মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি ট্রায়াল কোর্টে সাক্ষীকে যথাসময়ে আদালতে হাজির করতে হবে। কারণ, সাক্ষীর গরহাজিরার কারণে মামলার বিচার বিলম্বিত হয়।